ঝিনাইদহের বিভিন্ন বাজারে হঠাৎ করেই মুরগীর সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারে খুচরা পর্যায়ে ব্রয়লার, সোনালী, কক ও লেয়ারসহ কোন জাতের মুরগীই পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে অল্প কিছু মুরগী পাওয়া গেলেও চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।
ঝিনাইদহে হঠাৎ করেই মুরগীর সংকট

হঠাৎ বাজারে এমন মুরগী সংকট নিয়ে খামারিরা বলছেন, একটি সিন্ডিকেট খামারীদের জিম্মি করে বাচ্চা, মুরগীর খাদ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে মুরগীর বাচ্চার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়িয়ে চলেছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারের গ্রাহক পর্যায়ে। এদিকে মুরগী পালন সংক্রান্ত সব জিনিসের দাম দ্বিগুণ হলেও সে পরিমাণ মুরগীর মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারনে লোকসানের ভয়ে আপাতত চাষিরা মুরগী পালন বন্ধ করে দিয়েছেন।
যদিও জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন বাচ্চা সংকটের কারনে এমনটি হয়েছে, তবে দ্রুতই সংকট কেটে যাবে।
আর বাচ্চা উৎপাদনকারীদের বক্তব্য, খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি হলে বাাড়েনি বাচ্চার মূল্য। যে কারনে কোটি কোটি টাকা লোকসান কমাতে বাচ্চা উৎপাাদন কমিয়ে দিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় ছোট বড় ব্রয়লার মুরগীর খামার রয়েছে ১৮৮১, লেয়ার ২০৯ এবং দেশি মুরগীর খামার রয়েছে ১৬৭৭টি। এসব খামারে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, যাদের অনেকে এখন বেকার হতে চলেছে।
মুরগী সংসকট নিয়ে কথা হয় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভুটিয়ারগাতী গ্রামের খামারী রাশিদা ইয়াসমিনের সাথে। রাশিদা জানান, মুরগী বড় হয়ে গেছে, কয়েকদিনের মধ্যেই বিক্রির উপযোগী হবে। কিন্তু খামারে নতুন বাচ্চা তোলার চেষ্টা করলেও তা পাচ্ছি না। একটা ঘরের মুরগী আগেই বিক্রি করেছি, এখন নতুন বাচ্চা না পাওয়াই সেটি এখনও খালি। কোম্পানীর প্রতিনিধিরা বলছেন আমাদের কাছে বাচ্চা নেই, তাই আপনাদের দিতে পারছি না। তবে কি কারনে এমন হচ্ছে বার বার জানতে চাইলেও তারা কোন সদুত্তোর দেন না বলে যোগ করেন এই নারী উদ্যোক্তা।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার দরি গোবিন্দপুর গ্রামের খামারি নুর ইসলাম জানান, তার দুইট সেডের প্রতিটিতে ৯ হাজার করে মুরগী পালন করা হয়। বাচ্চা না পাওয়ায় গত দুই মাস হলো একটি সেড পড়ে আছে। অপরটি সেডটিও গত ২০ দিন হলো খালি হয়েছে কিন্তু বাচ্চা পাচ্ছি না। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ীর কাছে বাচ্চা পেলেও তার দাম দ্বিগুন হওয়ায় লোকসানের ভয়ে কিনতে পারছি না।
ঝিনাইদহের ছয় উপজেলার বিভিন্ন বাজারে খোজ নিয়ে জানা গেছে, এক কেজি পোল্ট্রি খামারীরা বিক্রি করছে ২২০ টাকা। যা খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা। একই মুরগী তিন থেকে চার সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি। একই সময় সোনালী মুরগী খামারীদের কাছ থেকে ৩১০ টাকা ক্রয় করে গ্রাহক পর্যায়ে ৩৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। যে সোনালী এক মাস আগে ২৩০ টাকায় ক্রয় করে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এছাড়া কক মুরগী ২৬০ টাকায় ক্রয় করে বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকা। যে মুরগী ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ আগেও ২৪০ টাকায় ক্রয় করে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ফলে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মুরগীর কেজি প্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরেজমিনে ভুটিয়ারগাতী এলাকার খামারী মোহাম্মদ আলীর খামারে গিয়ে দেখা যায়, তার দুইটি খামারের মধ্যে একটি খামার মুরগী শুন্য অবস্থায় রয়েছে। অপর খামারে কিছু মুরগী আছে। সেখানে তারা স্বামী স্ত্রী কাজ করছেন। তাও কয়েকদিনের মধ্যে বিক্রি হয়ে যাবে। নতুন মুরগী তুলতে চাইলেও বাচ্চা না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
তিনি জানান, বড় বড় মুরগীর বাচ্চা উৎপাদনকারী খামারীরা সিন্ডিকেট করে আমাদের বাচ্চা দিচ্ছে না। ফলে এমন লোকসানের মুখে পড়ছি। যার পভাব পড়ছে ভোক্তাদের উপর। আমরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। আবার প্রতি মাসেই খাবারের দাম বাড়ায় কোম্পানীগুলো। এক কথায় খামারী ও মুরগীর খাবার সিন্ডিকেটের হাতে আমরা বন্দী।
কোটচাাঁদপুর উপজেলা কাঁঠালিয়া গ্রামের খামারী বিল্লাল হোসেন জানান, তিনদিন আগে ৬২ টাকা পিচ মূল্যে ৫০০ পোল্ট্রি মুরগীর বাচ্চা ক্রয় করা হয়েছে। একই মুরগী এক মাস আগেও ৩০ থেকে ৩৫ টাকা প্রতি পিচ ক্রয় করা হয়। একই গ্রামের আব্দার হোসেন সোনালী মুরগেীর বাাচ্চা ৪৭ টাকা প্রতি পিচ মূল্যে ১২০০ বাচ্চা তুলেছেন। যে বাচ্চা এক মাস আগেও ২০ থেকে ২৫ টাকা মুল্যে ক্রয় করা হয়েছিল।

কালীগঞ্জ উপজেলা পাতবিলা গ্রামের খামারী আব্দুল ওহাব জানান, বর্তমানে সোনালী মুরগীর বাচ্চা ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা দরে ক্রয় করে ৫০০ মুরগী ৫৫ থেকে ৬০ দিনে খাদ্য ও ওষুধ দিয়ে পালন করতে আনুমানিক ১ লাখ ৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সেখানে মৃত্যু বাদ দিয়ে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও ৮৭ হাজার টাকার বেশি হবে না। ফলে ৫০০ মুরগীতে প্রায় ১০ হাজার টাকা লোকসান হবে। একই অবস্থা পোল্ট্রী মুরগীতেও। এমন অবস্থায় বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধের মূল্য কমানো ছাড়া খামারীদের মুরগী পালন করা সম্ভব না যোগ করেন এই খামারী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুরগীর বাচ্চা বিক্রির সাথে সংশ্লিষ্ট একজন জানান, আমরা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে রেখেছি। কিন্তু কোম্পানীগুলো বাচ্চা দিচ্ছে না। কোম্পানীগুলো বড় বড় খামার খুলে সেখানে বাচ্চা দিচ্ছে আর ক্ষুদ্র খামারীদের ও ব্যবসায়ীদের বাচ্চা দিচ্ছে না। তিনি আরো জানান, স্থানীয় বাচ্চা উৎপাদনকারী কিছু খামারী বাচ্চা দিলেও তারও দাম রাখা হচ্ছে অনেক বেশী।
জেলার শৈলকুপা বাজারের সবচেয়ে বড় মুরগী ব্যবসায়ী জিহাদ রানা জানান, প্রতি হাটে তার অন্তত এক হাজার মুরগীর চাহিদা থাকে। তবে তিনি ফার্ম থেকে শনিবার আনতে পেরেছেন মাত্র ২০০ ব্রয়লার মুরগী। সোনালী, কক, লেয়ার পাননি। সাধারণত শৈলকুপার বিভিন্ন ফার্ম ও জেলা সদরের ফার্ম থেকে মুরগী ক্রয় করে থাকেন। তবে গত সপ্তাহ থেকে কোন ফার্মেই মুরগী পাচ্ছেন না। পোল্ট্রী মুরগীর খাবার ও বাচ্চার দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় ফার্মগুলিতে মুরগী একেবারেই কমে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে।

জেলার সবথেকে বড় বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিভারসেল পোল্ট্রি হ্যাচারী মালিক এমএ কাদের জানান, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাচ্চা প্রতি উৎপাদন খরচ ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা ছিল। এ সময় বাচ্চা বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে ৩০ টাকা। মাঝে মাঝে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এ ৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। তিনি জানান পোল্ট্রি বাচ্চা উৎপাদনের সময় প্রধান খাবার সোয়ারিব কেক ও ভুট্টা। সোবায়াবিন কেক আগে ছিল ৩০ থেকে ৩৫ কেজি। যা বর্তমানে ৭৮ টাকা। ভুট্টা আগে ছিল ২০ টাকা বর্তমানে ৩৬ টাকা কেজি। এছাড়া বিদ্যুৎ ও ওষুধের মূল্য বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে কিন্তু সে পরিমাণ বাচ্চার দাম না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে ব্রয়লার মুরগীর বাচ্চা সপ্তাহে ১ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার উৎপাদন করা হত। বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্রয়লার ও সোনালী মিলে সপ্তাহে ৩০ থেকে ৫০ হাজার বাচ্চা উৎপাদন করা হচ্ছে।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা: মনোজিৎ কুমার সরকার জানান, আমাদের আপাতত মুরগীর কোন সংকট নেই। তবে কিছুদিন আগে বাচ্চার দাম বেশি থাকার কারণে অনেকেই মুরগী খামারে উঠাননি। এখন আবার দাম কমে গেছে সবাই আবার মুরগী চাষ শুরু করে দিয়েছে। আর মধ্যে বাজারেও মুরগীর দাম কমে যাবে বলে আশা করছি।
আরো পড়ুনঃ
২ thoughts on “ঝিনাইদহে হঠাৎ করেই মুরগীর সংকট”